পুঁজিতন্ত্রের স্বরূপ
সকল পুঁজিতন্ত্রী দেশেই দুইটী শ্রেণী—বুর্জোয়া ও প্রলিটারিয়েট, মালিক ও শ্রমিক। বুর্জোয়া শ্রমিককে শোষণ করে; ইহারা পরস্পরের বিরোধী। শ্রমিকের শ্রমের ফল বুর্জোয়া কিরূপে আত্মসাৎ করিতে সমর্থ হয় তাহা জানা আবশ্যক। পুঁজিতন্ত্রী শোষণের যথার্থ তথ্যটি আবিষ্কার করিয়াছেন মার্ক্স।
পুঁজিতন্ত্রী শোষণ কিরূপে সম্ভব হইতেছে? কিরূপে মালিক ক্রমেই বড় হইতেছে, কেনই বা শ্রমিক ক্রমেই দরিদ্র হইতেছে? কি সব অদৃশ্য শৃঙ্খল শ্রমিককে বাঁধিয়া রাখিয়াছে?
আমরা পূর্বেই সরল পণ্যোৎপাদনের কথা বলিয়াছি। সরল পণ্যোৎপাদনে উৎপাদনকারী নিজের হাতিয়ার দ্বারা নিজেই কাজ করে; ভাড়াটে শ্রমিক নিয়োগ করে না। কিন্তু এইরূপ উৎপাদনেই পুঁজিতন্ত্রের বীজ নিহিত; সরল পণ্যোৎপাদনই পুঁজিতন্ত্রে বিকশিত হয়। মূল্যের সূত্রটী পণ্যোৎপাদনের বিকাশের সূত্র। এই বিকাশই পুঁজিতন্ত্রে পরিণতি লাভ করে।
পুঁজিতন্ত্র কি? পুঁজিতন্ত্র পণ্যোৎপাদনের চরম পরিণতি, শ্রেষ্ঠ রূপ—এইরূপ উৎপাদনে শ্রমিকের শ্রমশক্তি পণ্যে পরিণত হয়।
পণ্যোৎপাদনে উৎপাদনকারী বাজারে বিক্রয়ের জন্য পণ্য উৎপাদন করে, নিজের ব্যবহার অথবা ভোগের জন্য উৎপাদন করে না। মূল্যের সূত্রটিই পণ্যের উৎপাদন ও বিনিময়কে নিয়ন্ত্রণ করে। পণ্যের বিনিময় হয় উহাদের মূল্য অনুসারে; সমাজ-নিরূপিত শ্রমসময় দ্বারা এই মূল্য স্থির হয়। পুঁজিতন্ত্র পণ্যোৎপাদন এবং উহার সূত্রগুলিকে বাতিল করে না। পক্ষান্তরে, পুঁজিতন্ত্রে পণ্যোৎপাদন চরম বিকাশ লাভ করে। অতএব পণ্যোৎপাদনের সূত্র, বিশেষত মূল্যের সূত্রটিই, পুঁজিতন্ত্রের ভিত্তি।
প্রথম হইতেই পুঁজিতন্ত্রের দুইটী বিশেষত্ব: (১) পুঁজিতন্ত্রে যে-সব দ্রব্য উৎপাদিত হয় তাহা পণ্য; এই পণ্য বাজারে বিক্রয়ের জন্যই উৎপাদন করা হয়। সরল পণ্যোৎপাদনেও যে-সব দ্রব্য উৎপাদিত হয় তাহা পণ্য। তবে পুঁজিতন্ত্র ও সরল পণ্যোৎপাদনে প্রভেদ কোথায়? পুঁজিতন্ত্রে শ্রমিক নিজেই একজন বিক্রেতা; শ্রমিক তাহার শ্রমশক্তি বিক্রয় করে। (২) পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদনের লক্ষ্য উদ্বৃত্ত মূল্যের (surplus-value) সৃষ্টি; এই উদ্বৃত্ত মূল্য দ্বারাই পুঁজির বৃদ্ধি হয়।
পণ্যোৎপাদনের কাঠামোটুকু পুঁজিতন্ত্রেই প্রসার লাভ করে। পুঁজিতন্ত্রে একটী নূতন পণ্যের আবির্ভাব হয়। এই পণ্যটাই শ্রমশক্তি। ইহা কি প্রকারের পণ্য? এই পণ্যের সংজ্ঞা মার্ক্স নিম্নোক্তরূপে দিয়াছেন, “শ্রমশক্তি অথবা শ্রমের সামর্থ্য বলিতে আমরা মানুষের সেই সব শারীরিক ও মানসিক বৃত্তিগুলিকেই বুঝি যাহা সে যে-কোন প্রকারের ব্যবহার মূল্য উৎপাদন করিতে প্রয়োগ করে।”
মার্ক্স আরো বলিয়াছেন, “পুঁজিপতি শ্রমশক্তি ক্রয় করে উহা কাজে লাগানোর জন্য; শ্রমশক্তির প্রয়োগই শ্রম।”
পুঁজিতন্ত্রেই শ্রমশক্তি পণ্য। সকল সময়ই কি ইহা পণ্য? একজন ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীর কথাই ধরা যাউক। সে তাহার ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ডটুকুতে অথবা ক্ষুদ্র কারখানায় নিজেই কাজ করে। সে তাহার উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রয় করে, কিন্তু নিজের শ্রমশক্তি বিক্রয় করে না। সে নিজেই শ্রমশক্তি খাটায়। ইহা পরিষ্কার যে যতদিন ভূমি ও কারখানা তাহার নিজের থাকে, ততদিনই তাহার শ্রমশক্তি সে নিজেই খাটাইতে পারে। কারিগর যদি তাহার হাতিয়ার এবং উৎপাদনের উপকরণ হইতে বঞ্চিত হয়, কৃষক যদি তাহার ভূমিখণ্ডটুকু হারায়, তবে আর তাহারা নিজেদের শ্রমশক্তি নিজেরা খাটাইতে পারে না। এরূপ অবস্থায় তাহারা পুঁজিপতির শরণাপন্ন হয়। কারখানা, ভূমি, যন্ত্র, রেল—সবই এখন পুঁজিপতির সম্পত্তি। পুঁজিপতির শরণাপন্ন হওয়া অর্থ পুঁজিপতির নিকট শ্রমশক্তি বিক্রয়।
অতএব আমরা দেখিতেছি, পুঁজির জন্ম নির্ভর করে কতকগুলি বিশেষ অবস্থার উপর। প্রথমত, কতকগুলি লোকের উৎপাদনের সমস্ত উপকরণগুলির মালিক হওয়া প্রয়োজন। অপরপক্ষে, এমন একশ্রেণীর লোক থাকা চাই যাহারা তাহাদের শ্রমশক্তি বিক্রয় করিতে বাধ্য হয়। পণ্যোৎপাদনের পূর্ণ বিকাশের সময়ে এইরূপ অবস্থা ঘটে। কতিপয় লোকের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ মুদ্রার সঞ্চয় হয়; বহুলোক বিত্তহীন মজুরে পরিণত হয়। শ্রমিক তখন দুই অর্থে স্বাধীন। তাহার চলাফেরার স্বাধীনতা আছে; সামন্তযুগের বন্ধন আর এখন নাই। শুধু এই মুক্তিই নয়, শ্রমিক মুক্তি লাভ করিয়াছে উৎপাদনের উপকরণ-গুলির স্বত্ব হইতে। তাহার ভূমি নাই, হাতিয়ার নাই, কাঁচামাল নাই। সামন্তযুগের অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসের উপরই পুঁজিতন্ত্রের আবির্ভাব। পুঁজিতন্ত্র পূর্ব্বেকার সকল সমাজ ব্যবস্থাকে আমূল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments